জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, অনার্স এবং সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের জন্য অ্যাসাইনমেন্ট লেখার নিময় সহ পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন
অ্যাসাইনমেন্ট বা নির্ধারিত কাজ বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ। বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অনার্স পর্যায়ে ইনকোর্স পরীক্ষার নম্বর বা গ্রেডিংয়ের একটি বড় অংশ নির্ভর করে এই অ্যাসাইনমেন্টের ওপর। অনেক শিক্ষার্থীই সঠিক নিয়ম না জানার কারণে অনেক পরিশ্রম করে অ্যাসাইনমেন্ট লিখলেও আশানুরূপ নম্বর পায় না। একজন বড় ভাই হিসেবে এবং এই শিক্ষা সেক্টরে দীর্ঘ ১০ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি তোমাদের জন্য আজ অ্যাসাইনমেন্ট লেখার একটি গভীর ও পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন তৈরি করছি। এটি অনুসরণ করলে শুধু নম্বর নয়, শিক্ষকের চোখে তোমার সৃজনশীলতাও ফুটে উঠবে।
অ্যাসাইনমেন্ট আসলে কী
সহজ ভাষায় বলতে গেলে অ্যাসাইনমেন্ট হলো নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ের ওপর একটি বিস্তারিত লিখিত প্রতিবেদন। এটি অনেকটা গবেষণাধর্মী কাজ। শিক্ষক তোমাকে একটি বিষয় বা প্রশ্ন দেবেন এবং তুমি সেই বিষয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিজের ভাষায় তা উপস্থাপন করবে। এটি কেবল তথ্য সাজানো নয়, বরং ওই বিষয়টি তুমি কতটা গভীরভাবে বুঝতে পেরেছ তার একটি প্রমাণ।
অ্যাসাইনমেন্ট লেখার ধাপসমূহ ও সঠিক নিয়ম
একটি আদর্শ অ্যাসাইনমেন্ট সাধারণত তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত থাকে: ভূমিকা, মূল অংশ এবং উপসংহার। তবে এর বাইরেও কিছু কারিগরি দিক রয়েছে যা তোমার অ্যাসাইনমেন্টকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে।
১. বিষয় নির্বাচন ও গবেষণা
অ্যাসাইনমেন্ট লিখতে বসার আগে প্রশ্নটি বারবার পড়ো। শিক্ষক ঠিক কী জানতে চেয়েছেন তা আগে বুঝে নাও। এরপর ইন্টারনেট, পাঠ্যবই, লাইব্রেরির বই বা জার্নাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করো। মনে রাখবে, কারো অ্যাসাইনমেন্ট দেখে হুবহু কপি করা মানে নিজের সৃজনশীলতাকে মেরে ফেলা। তথ্য নাও সবার থেকে, কিন্তু লেখো নিজের ভাষায়।
২. কভার পেজ বা প্রচ্ছদ তৈরি
অ্যাসাইনমেন্টের প্রথম ইম্প্রেশন তৈরি হয় এর কভার পেজ দেখে। এটি হতে হবে একদম পরিষ্কার এবং তথ্যবহুল। কভার পেজে সাধারণত নিচের তথ্যগুলো ক্রমান্বয়ে থাকতে হয়:
প্রতিষ্ঠানের নাম ও লোগো (খাতার একদম ওপরে মাঝখানে)
অ্যাসাইনমেন্টের শিরোনাম (স্পষ্ট বড় অক্ষরে)
কোর্সের নাম ও কোর্স কোড
শিক্ষার্থীর নাম, রোল নম্বর, রেজিস্ট্রেশন নম্বর এবং শিক্ষাবর্ষ
বিভাগের নাম
বিষয় শিক্ষকের নাম ও পদবি
জমাদানের তারিখ
তুমি চাইলে কভার পেজ হাতে লিখতে পারো অথবা কম্পিউটার থেকে ডিজাইন করে প্রিন্ট করে নিতে পারো। তবে কম্পিউটার প্রিন্ট করা কভার পেজ দেখতে বেশি প্রফেশনাল লাগে।
৩. সূচিপত্র
যদি তোমার অ্যাসাইনমেন্টটি অনেক বড় হয় (যেমন ১০-১৫ পৃষ্ঠা), তবে একটি সূচিপত্র যোগ করা বাধ্যতামূলক। সূচিপত্রে কোন আলোচনা কত নম্বর পৃষ্ঠায় আছে তা উল্লেখ থাকলে শিক্ষকের পক্ষে বিষয়টি দ্রুত বুঝতে সুবিধা হয়।
৪. ভূমিকা
এটি হলো অ্যাসাইনমেন্টের প্রবেশদ্বার। এখানে আলোচিত বিষয়টি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ও স্বচ্ছ ধারণা দিতে হবে। ভূমিকা এমনভাবে লিখতে হবে যেন পাঠক এটি পড়েই বুঝতে পারে ভেতরে কী আলোচনা করা হয়েছে। ভাষা হবে সহজ ও সাবলীল।
৫. মূল অংশ বা বর্ণনা
এটি অ্যাসাইনমেন্টের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে মূল প্রশ্ন বা বিষয়ের ওপর বিশদ বিবরণ দিতে হবে। বড় বড় অনুচ্ছেদে না লিখে ছোট ছোট প্যারা বা পয়েন্ট আকারে লিখলে শিক্ষকের পড়তে সুবিধা হয়। পয়েন্টগুলো নীল কালির কলম দিয়ে লিখলে খাতার সৌন্দর্য বাড়ে। প্রয়োজনীয় তথ্য, উপাত্ত, ছক বা ম্যাপ থাকলে এখানে যুক্ত করতে হবে।
৬. উপসংহার
এখানে পুরো আলোচনার একটি সারসংক্ষেপ বা ফলাফল টেনে ইতি টানতে হবে। তোমার নিজস্ব মতামত বা ওই বিষয়ের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে দুই-এক লাইন লিখতে পারো। এটি যেন খুব বেশি বড় না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবে।
৭. তথ্যসূত্র বা রেফারেন্স
অ্যাসাইনমেন্টের শেষে অবশ্যই তথ্যসূত্র দিতে হবে। তুমি কোন বই থেকে তথ্য নিয়েছ, কোন ওয়েবসাইট ব্যবহার করেছ বা কোন লেখকের লেখা পড়েছ তা এখানে উল্লেখ করতে হবে। এটি তোমার লেখার গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
কারিগরি কিছু নিয়ম যা অবশ্যই মেনে চলতে হবে
কাগজ ও মার্জিন: সবসময় এ ফোর সাইজের সাদা কাগজ ব্যবহার করবে। কাগজের চারদিকে অন্তত এক ইঞ্চি পরিমাণ মার্জিন টেনে নেবে। মার্জিন টানার জন্য পেন্সিল ব্যবহার করা ভালো।
এক পাশে লেখা: একটি আদর্শ অ্যাসাইনমেন্টের নিয়ম হলো কাগজের কেবল এক পাশে লেখা। অপর পাশটি খালি রাখতে হয়। এতে খাতা পরিষ্কার থাকে এবং ওভারল্যাপ হওয়ার ভয় থাকে না।
কলম ও কালির ব্যবহার: মূল লেখা সবসময় কালো বলপেন দিয়ে লিখবে। জেল পেন ব্যবহার না করাই ভালো কারণ এটি কাগজের অন্য পাশে ছাপ ফেলে দিতে পারে। পয়েন্ট বা হেডলাইনের জন্য নীল কালির সাইনপেন বা কলম ব্যবহার করা যেতে পারে। লাল, কমলা বা সবুজ রঙের কালি ব্যবহার করা একদম নিষেধ।
অক্ষরের মাপ ও পরিচ্ছন্নতা: হাতের লেখা পরিষ্কার ও স্পষ্ট হতে হবে। খুব বেশি কাটাকাটি করা যাবে না। যদি কোনো ভুল হয় তবে হালকা করে এক টানে কেটে দেবে, ঘষাঘষি করবে না। প্রতিটি লাইনের মাঝে এবং প্রতিটি শব্দের মাঝে পর্যাপ্ত জায়গা রাখবে যাতে লেখাগুলো জট পাকিয়ে না যায়।
চিত্র ও ডায়াগ্রাম: যদি প্রয়োজন হয় তবে অবশ্যই হাতে আঁকা চিত্র বা গ্রাফ যুক্ত করবে। এতে তোমার পরিশ্রম এবং বিষয়ের ওপর দখল ফুটে ওঠে। চিত্রের নিচে ক্যাপশন দিতে ভুলবে না।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের বিশেষ কিছু জিজ্ঞাসা ও সমাধান
১. ভাইয়া, অ্যাসাইনমেন্ট কত পৃষ্ঠার হতে হয়
এটি নির্ভর করে বিষয়ের গুরুত্ব এবং শিক্ষকের নির্দেশনার ওপর। সাধারণত অনার্স লেভেলে ৫ থেকে ১০ পৃষ্ঠার অ্যাসাইনমেন্ট আদর্শ বলে ধরা হয়। তবে যদি গবেষণাধর্মী কাজ হয় তবে তা আরও বাড়তে পারে। মনে রাখবে, পৃষ্ঠার সংখ্যার চেয়ে তথ্যের মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
২. নীল কালি কি ব্যবহার করা যাবে
হ্যাঁ, পয়েন্ট বা হেডলাইনের জন্য নীল কালি ব্যবহার করা যাবে এবং এটি খাতার সৌন্দর্য বাড়ায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন কালি ছড়িয়ে না যায়।
৩. অনলাইন থেকে কপি করলে কি ধরা খাব
অবশ্যই। বর্তমানে শিক্ষকরা অনেক সচেতন। তুমি যদি কোনো ওয়েবসাইট থেকে হুবহু কপি করো তবে শিক্ষক তা সহজেই ধরে ফেলবেন। তাই অনলাইন থেকে কেবল ধারণা নাও, কিন্তু বাক্যগুলো নিজের মতো করে সাজাও।
৪. নির্দিষ্ট তারিখের পরে জমা দিলে কী হয়
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা যেকোনো পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে সময়ের মূল্য অনেক বেশি। নির্দিষ্ট তারিখ পার হয়ে গেলে অনেক সময় বিভাগ থেকে অ্যাসাইনমেন্ট গ্রহণ করা হয় না বা নম্বর কমিয়ে দেওয়া হয়। তাই ডেডলাইনের অন্তত দুই দিন আগে কাজ শেষ করার চেষ্টা করো।
৫. হাতে লেখা ভালো নাকি কম্পিউটার টাইপ
অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা হাতে লেখা অ্যাসাইনমেন্ট পছন্দ করেন কারণ এতে বোঝা যায় শিক্ষার্থী নিজে খাটুনি করেছে। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে কম্পিউটার টাইপ করার নির্দেশ থাকলে কেবল তখনই টাইপ করবে।
অ্যাসাইনমেন্ট লেখার সময় মনে রাখার মতো কিছু প্রো-টিপস
সহজ বাক্য ব্যবহার করো। অপ্রয়োজনীয় অলংকারিক শব্দ বা খুব জটিল ভাষা ব্যবহারের দরকার নেই।
সবগুলো পৃষ্ঠার নম্বর দাও। এটি সূচিপত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার আগে অন্তত একবার পুরোটা পড়ে দেখো। বানান ভুল বা ব্যাকরণগত ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করে নাও।
কারো কাছ থেকে টাকা দিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট লিখিয়ে নেবে না। এটি তোমার নিজের মেধা বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
সবগুলো পৃষ্ঠাকে সুন্দর করে স্ট্যাপলার বা স্পাইরাল বাইন্ডিং করো। একটি স্বচ্ছ ফাইল বা ফোল্ডারে ভরে জমা দিলে তা দেখতে আরও আকর্ষণীয় হয়।
অ্যাসাইনমেন্ট কেবল একটি খাতা জমা দেওয়া নয়, এটি তোমার অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ারের একটি প্রতিফলন। তুমি যত বেশি সময় নিয়ে এবং মনোযোগ দিয়ে এটি তৈরি করবে, তোমার ইনকোর্স বা ইন্টারনাল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে। আশা করি এই বিস্তারিত গাইডলাইনটি তোমাদের উপকারে আসবে। যদি আরও কিছু জানার থাকে তবে নিঃসংকোচে আমাকে জানাতে পারো। ভালো থেকো আর পড়াশোনায় মন দাও।