18th BJS Written solution answer বিজেএস লিখিত প্রশ্ন

 বিজেএস লিখিত পরীক্ষার ‘পারিবারিক সম্পর্ক বিষয়ক আইন’ (বিষয় কোড: ৭৪) প্রশ্নপত্রের সকল প্রধান প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ নমুনা উত্তর নিচে দেওয়া হলো। প্রতিটি উত্তরের মান এবং দৈর্ঘ্য বিজেএস পরীক্ষার স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সাজানো হয়েছে।


১ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: ইসলামিক আইন বিজ্ঞানের উৎস ও বিবর্তন

প্রশ্ন:

ক) ইসলামিক আইন বিজ্ঞানের ধারণা ব্যাখ্যা কর। [৭]

খ) “পবিত্র কোরআন মুসলিম আইনের সর্বোচ্চ ও মৌলিক উৎস হলেও একমাত্র উৎস নয়”- ব্যাখ্যা করুন। [৭]

গ) প্রাক-ইসলামিক আরবের প্রথাসমূহ কিভাবে মুসলিম আইনের বিকাশকে প্রভাবিত করেছে তা আলোচনা করুন। [৬]

নমুনা উত্তর:

ক) ইসলামিক আইন বিজ্ঞানের ধারণা: ইসলামিক আইন বিজ্ঞান বা ‘ফিকহ’ (Fiqh) বলতে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর মূলনীতি থেকে উদ্ভূত ব্যবহারিক বিধানসমূহের পদ্ধতিগত জ্ঞানকে বোঝায়। এটি কেবল কিছু প্রথা নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের একটি আইনি কাঠামো। ইমাম আবু হানিফার মতে, ফিকহ হলো আত্মার সেই সচেতনতা যা নিজের অধিকার এবং কর্তব্য সম্পর্কে ধারণা দেয়।

খ) কুরআনের সীমাবদ্ধতা ও অন্যান্য উৎস: পবিত্র কুরআন মুসলিম আইনের প্রধান ও ঐশ্বরিক উৎস হলেও এতে জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ের আইনি সমাধান সরাসরি সংকলিত নেই। কুরআন মূলত মৌলিক নীতিমালা (General Principles) প্রদান করে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তরাধিকারের অংশ কুরআনে থাকলেও অংশ বণ্টনের গাণিতিক জটিলতা সমাধানের জন্য সুন্নাহ বা ইজমার প্রয়োজন হয়। তাই সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস একত্রে মুসলিম আইনকে পূর্ণাঙ্গতা দান করে।

গ) প্রাক-ইসলামিক প্রথার প্রভাব: ইসলাম আগমনের পূর্বে আরবে ‘উর্ফ’ বা প্রথা প্রচলিত ছিল। ইসলাম এই প্রথাগুলোকে তিনভাবে যাচাই করে: অন্যায় প্রথা (যেমন কন্যাসন্তান হত্যা) বাতিল করেছে, কিছু প্রথা (যেমন ব্যবসায়িক সততা) অনুমোদন করেছে এবং কিছু প্রথা (যেমন উত্তরাধিকার ও বিবাহ) সংস্কার করেছে। এটি মুসলিম আইনের ভিত্তি গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে।


২ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: হক শুফা বা প্রাক-ক্রয় অধিকার

প্রশ্ন:

ক) মুসলিম আইন অনুসারে হক শুফা’র দাবি প্রতিষ্ঠা করার জন্য কী কী আনুষ্ঠানিকতা প্রতিপালন করা অত্যাবশ্যক? আলোচনা করুন। [১০]

খ) মুসলিম আইনের অধীনে কখন একজন শাফী তার হক শুফা’র অধিকার পরিত্যাগ করতে পারে? [৪]

গ) নিম্নবর্ণিত ক্ষেত্রে মুসলিম আইন অনুসারে হক শুফা’র অধিকার দাবি করা যাবে কি? [৬]

নমুনা উত্তর:

ক) হক শুফা’র আনুষ্ঠানিকতা (তলবসমূহ): হক শুফা প্রয়োগের জন্য তিনটি স্তর পার করতে হয়:

১. তলব-ই-মওয়াসিবত: সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিকভাবে কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করা।

২. তলব-ই-イশহাদ: দুইজন সাক্ষীর সামনে ক্রেতা বা বিক্রেতা বা জমির সামনে গিয়ে পুনরায় দাবি নিশ্চিত করা।

৩. তলব-ই-খাসুমত: বিক্রয়ের চার মাসের মধ্যে আদালতে মামলা দায়ের করা।

খ) অধিকার পরিত্যাগ: যদি শাফী সরাসরি বলে দেন যে তিনি কিনবেন না, অথবা তিনি যদি বিক্রয় দলিলে সাক্ষী হিসেবে সই করেন, তবে তার এই অধিকার বাতিল হয়ে যায়। এছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তলব পালন না করলেও অধিকার নষ্ট হয়।

গ) বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ: (i) দানসূত্রে পাওয়া সম্পত্তিতে হক শুফা চলে না। (ii) চিরস্থায়ী লীজের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর নয় কারণ মালিকানা বদল হয় না। (iii) কেবল বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতে এটি দাবি করা যায় না যতক্ষণ না রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়।


৩ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: উইল বা ওসিয়ত

প্রশ্ন:

ক) হানাফি মতবাদ অনুসারে ‘উইল’ এর সংজ্ঞা দিন। উইল কিভাবে প্রত্যাহার করা যায়? [৪]

খ) কোন কোন ব্যক্তি উইল করতে পারে? কোন কোন সম্পত্তি এবং কি পরিমাণ সম্পত্তি উইল করা যায়? [১০]

গ) কারণ উল্লেখপূর্বক উইলের বৈধতা নিরূপণ করুন। [৬]

নমুনা উত্তর:

ক) উইলের সংজ্ঞা ও প্রত্যাহার: উইল হলো এমন একটি দান যা মৃত্যুর পর কার্যকর হয়। দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় মৌখিকভাবে বা নতুন উইল লিখে আগের উইল প্রত্যাহার করতে পারেন। উইলকৃত সম্পত্তি বিক্রি করে ফেললেও তা প্রত্যাহার হিসেবে গণ্য হয়।

খ) যোগ্যতা ও পরিমাণ: ১৮ বছর বয়সী সুস্থ মস্তিষ্কের যেকোনো মুসলিম উইল করতে পারেন। তবে তিনি তার নিট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) উইল করতে পারেন। উত্তরাধিকারীর অনুকূলে উইল করতে হলে অন্য সকল উত্তরাধিকারীর সম্মতি আবশ্যক।


৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার

প্রশ্ন: উত্তরাধিকার সংক্রান্ত গাণিতিক সমস্যা ও অংশ বণ্টন। [২০]

নমুনা উত্তর: এই প্রশ্নে সাধারণত একটি মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া আত্মীয়দের তালিকা থাকে।

  • নীতি: স্ত্রী (সন্তান থাকলে ১/৮), পিতা ও মাতা (১/৬ করে)। বাকি অংশ আসাবা হিসেবে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ২:১ অনুপাতে বণ্টন করতে হয়। উত্তর করার সময় নির্দিষ্ট ছক ব্যবহার করা নম্বর বৃদ্ধিতে সহায়ক।


৫ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: হিন্দু ও খ্রিস্টান আইন

প্রশ্ন: ক) হিন্দু দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা মতবাদের পার্থক্য। খ) খ্রিস্টান বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের বিধান। [২০]

নমুনা উত্তর:

  • দায়ভাগ বনাম মিতাক্ষরা: দায়ভাগ (বাংলায় প্রচলিত) মতে পিতার মৃত্যুর আগে পুত্রের কোনো অধিকার নেই। মিতাক্ষরা মতে জন্মসূত্রে পুত্র মালিকানা পায়।

  • খ্রিস্টান ডিভোর্স: ১৮৬৯ সালের আইন অনুযায়ী ব্যভিচার, নিষ্ঠুরতা বা ধর্মান্তরের কারণে আদালতে মামলা করে বিবাহ বিচ্ছেদ নিতে হয়।


৬ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২

প্রশ্ন: বিশেষ বিবাহ আইনের শর্ত ও ফলাফল আলোচনা করুন। [২০]

নমুনা উত্তর: এই আইন অনুযায়ী যারা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মে বিশ্বাস করেন না তারা বিয়ে করতে পারেন। এই আইনের অধীনে বিয়ে করলে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে পার্সোনাল ল’র বদলে ১৮২৫ সালের উত্তরাধিকার আইন কার্যকর হয়।


৭ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: অভিভাবকত্ব ও প্রতিপালন

প্রশ্ন: মুসলিম আইনে মাতার হিজানত বা প্রতিপালনের অধিকার ও এর সীমাবদ্ধতা। [২০]

নমুনা উত্তর: হানাফি আইন অনুযায়ী মাতা ছেলেকে ৭ বছর এবং মেয়েকে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত নিজের কাছে রাখার অধিকারী। তবে মাতা যদি পরপুরুষকে বিয়ে করেন বা ইসলাম ত্যাগ করেন, তবে তিনি এই অধিকার হারাবেন।


৮ নম্বর প্রশ্নের উত্তর: পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫

প্রশ্ন: পারিবারিক আদালতের এখতিয়ার ও বিচার পদ্ধতি। [২০]

নমুনা উত্তর: ১৯৮৫ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী পাঁচটি বিষয়ে (ডিভোর্স, মোহরানা, ভরণপোষণ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার ও অভিভাবকত্ব) এই আদালতের একচ্ছত্র এখতিয়ার রয়েছে। এর বিচার পদ্ধতি দেওয়ানি কার্যবিধির চেয়ে অনেক বেশি সংক্ষিপ্ত ও দ্রুততর।

১৪শ বিজেএস (২০২১) লিখিত পরীক্ষার “পারিবারিক সম্পর্ক বিষয়ক আইন” (বিষয় কোড: ৭৪) প্রশ্নপত্রের ২ নম্বর প্রশ্নটি এবং এর বিস্তারিত নমুনা উত্তর নিচে প্রদান করা হলো:

প্রশ্ন ২:

ক) মুসলিম আইন অনুসারে হক শুফা’র দাবি প্রতিষ্ঠা করার জন্য কী কী আনুষ্ঠানিকতা প্রতিপালন করা অত্যাবশ্যক? আলোচনা করুন। [১০]

খ) মুসলিম আইনের অধীনে কখন একজন শাফী তার হক শুফা’র অধিকার পরিত্যাগ করতে পারে? [৪]

গ) নিম্নবর্ণিত ক্ষেত্রে মুসলিম আইন অনুসারে হক শুফা’র অধিকার দাবি করা যাবে কি? [৩x২=৬]

i) দানসূত্রে পাওয়া কোনো স্থাবর সম্পত্তির উপর

ii) চিরস্থায়ী লীজ প্রদান করা হলে

iii) ভবিষ্যতের কোনো সময়ে কোনো সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তির উপর।


নমুনা উত্তর

ক) হক শুফা’র দাবি প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিকতা (Formalities of Pre-emption):

মুসলিম আইনে হক শুফা বা প্রাক-ক্রয় অধিকার একটি অত্যন্ত দুর্বল অধিকার হিসেবে পরিচিত। এই অধিকার কেবল তখনই বলবৎ করা যায় যদি শাফী (দাবিদার) বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার পর তিনটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আনুষ্ঠানিকতা বা ‘তলব’ (Demands) যথাযথভাবে পালন করেন। এগুলো হলো:

১. তলব-ই-মওয়াসিবত (Talab-i-Mowasibat):

একে ‘তাৎক্ষণিক দাবি’ বলা হয়। যখনই শাফী নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে সম্পত্তি বিক্রয়ের সংবাদ পাবেন, তখনই সেই মুহূর্তে কোনো বিলম্ব না করে তাকে ক্রয়ের ঘোষণা দিতে হবে। সংবাদ পাওয়ার পর যদি তিনি এক মুহূর্ত দেরি করেন বা অন্য কোনো কাজে লিপ্ত হন (যেমন— দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়া বা অন্য বিষয়ে কথা বলা), তবে তার এই অধিকার চিরতরে লুপ্ত হয়। এমনকি তিনি যে দামে সম্পত্তিটি বিক্রি হয়েছে তার চেয়ে বেশি দামে কেনার ইচ্ছা থাকলেও এই প্রাথমিক দাবি জানানো বাধ্যতামূলক।

২. তলব-ই-ইশহাদ (Talab-i-Ishhad):

এটি সাক্ষীর উপস্থিতিতে দাবির নিশ্চয়তা প্রদান। প্রথম দাবির পর যথাসম্ভব দ্রুত শাফীকে দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নিম্নোক্ত তিনটির যেকোনো এক জায়গায় গিয়ে পুনরায় দাবি উত্থাপন করতে হবে:

  • ক্রেতার উপস্থিতিতে; অথবা

  • বিক্রেতার উপস্থিতিতে; অথবা

  • বিক্রয়কৃত স্থাবর সম্পত্তির সামনে দাঁড়িয়ে।

    এই দাবির সময় শাফীকে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে যে, তিনি ইতিপূর্বে ‘তলব-ই-মওয়াসিবত’ বা তাৎক্ষণিক দাবি জানিয়েছিলেন এবং এখন সাক্ষীগণের উপস্থিতিতে তার সেই অধিকার পুনরায় নিশ্চিত করছেন।

৩. তলব-ই-খাসুমত (Talab-i-Khasumat):

যদি ক্রেতা বা বিক্রেতা সম্পত্তি সমমূল্যে শাফীর নিকট হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে, তবে শাফীকে আদালতের আশ্রয় নিতে হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী, বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার তারিখ থেকে ৪ (চার) মাসের মধ্যে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতে (বর্তমানে পারিবারিক আদালত) মামলা দায়ের করার মাধ্যমে এই দাবি চূড়ান্ত করতে হয়। একে ‘মামলার মাধ্যমে দাবি’ বলা হয়।

খ) হক শুফা’র অধিকার পরিত্যাগ (Extinguishment of Pre-emption):

একজন শাফী বা প্রাক-ক্রয়াধিকারী নিম্নবর্ণিত পরিস্থিতিতে তার অধিকার হারাতে বা পরিত্যাগ করতে পারেন:

১. প্রকাশ্য পরিত্যাগ: যদি বিক্রয়ের আগে বা পরে শাফী মৌখিক বা লিখিতভাবে ঘোষণা দেন যে, তিনি উক্ত সম্পত্তিটি কিনবেন না বা তার দাবির কোনো ইচ্ছা নেই।

২. আচরণের মাধ্যমে পরিত্যাগ (Implied Release): যদি শাফী এমন কোনো কাজ করেন যা বিক্রয়ের প্রতি তার মৌন সম্মতি প্রকাশ করে। যেমন— তিনি নিজে যদি ওই বিক্রয় দলিলে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন অথবা ক্রেতাকে বাড়ি মেরামতে সহায়তা করেন।

৩. তলব পালনে ব্যর্থতা: যদি তিনি সংবাদ পাওয়ার পর ‘তলব-ই-মওয়াসিবত’ বা ‘তলব-ই-ইশহাদ’ যথাযথভাবে এবং নির্দিষ্ট পদ্ধতির মধ্যে সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হন।

৪. তামাদি: যদি বিক্রয় সম্পন্ন হওয়ার ৪ মাসের মধ্যে আদালতে মামলা দায়ের না করেন।

গ) বিশেষ ক্ষেত্রে হক শুফা’র দাবি নিরূপণ:

i) দানসূত্রে পাওয়া কোনো স্থাবর সম্পত্তির উপর:

উত্তর: না, দাবি করা যাবে না। হক শুফা কেবল বিনিময়ের মাধ্যমে সম্পন্ন বিক্রয়ের (Sale) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হিব্বা বা দান কোনো বিক্রয় নয় এবং এতে কোনো আর্থিক বিনিময় থাকে না। তাই দানকৃত সম্পত্তির ওপর প্রতিবেশী বা অংশীদার হক শুফা দাবি করতে পারেন না।

ii) চিরস্থায়ী লীজ প্রদান করা হলে:

উত্তর: না, দাবি করা যাবে না। মুসলিম আইনে হক শুফা কার্যকর হওয়ার পূর্বশর্ত হলো মালিকানা সম্পূর্ণভাবে এবং স্থায়ীভাবে হস্তান্তর হতে হবে। চিরস্থায়ী লীজ বা ইজারা (Lease) মূলত ভোগদখলের অধিকার প্রদান করে, কিন্তু জমির মূল মালিকানা (Ownership) হস্তান্তর করে না। তাই এটি হক শুফা’র এখতিয়ারভুক্ত নয়।

iii) ভবিষ্যতের কোনো সময়ে কোনো সম্পত্তি বিক্রয়ের চুক্তির উপর:

উত্তর: না, দাবি করা যাবে না। কেবল বিক্রয় চুক্তি বা ‘বয়নানামা’ (Agreement to Sell) দ্বারা মালিকানা হস্তান্তর হয় না। হক শুফা কেবল তখনই উৎপন্ন হয় যখন বিক্রয় চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হয় (অর্থাৎ রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়)। ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্য বিক্রয়ের আশঙ্কায় আগাম হক শুফা দাবি করা আইনত সম্ভব নয়।

**প্রশ্ন ৪:**

**ক) একজন মুসলিম মহিলার মৃত্যুকালে স্বামী, পিতা, মাতা এবং দুই কন্যা বর্তমান ছিলেন। তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির অংশ বণ্টন করুন। [১০]**

**খ) মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে ‘আউল’ (Aul) ও ‘রদ’ (Rudd) নীতি বলতে কী বুঝায়? উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করুন। [১০]**

নমুনা উত্তর

**ক) গাণিতিক সমস্যার সমাধান (উত্তরাধিকার বণ্টন):**

মুসলিম হানাফি আইন অনুযায়ী মৃত মহিলার ত্যাজ্য সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে নিম্নোক্তভাবে বণ্টিত হবে:

১. **স্বামী (Husband):** যেহেতু মৃত ব্যক্তির সন্তান (দুই কন্যা) বর্তমান আছে, তাই স্বামী পাবেন মোট সম্পত্তির **১/৪ (এক-চতুর্থাংশ)** অংশ।

২. **পিতা (Father):** সন্তান থাকার কারণে পিতা অংশীদার (Sharer) হিসেবে পাবেন **১/৬ (এক-ষষ্ঠাংশ)** অংশ।

৩. **মাতা (Mother):** সন্তান থাকার কারণে মাতাও অংশীদার হিসেবে পাবেন **১/৬ (এক-ষষ্ঠাংশ)** অংশ।

৪. **দুই কন্যা (Two Daughters):** মৃত ব্যক্তির পুত্র না থাকায় দুই বা ততোধিক কন্যা সম্মিলিতভাবে পাবেন **২/৩ (দুই-তৃতীয়াংশ)** অংশ।

**গাণিতিক বিশ্লেষণ (লঘিষ্ঠ সাধারণ হর বা ল.সা.গু নির্ণয়):**

অংশগুলো হলো: ১/৪, ১/৬, ১/৬ এবং ২/৩।

এদের হরের ল.সা.গু হলো ১২।

* স্বামী: ১২ এর ১/৪ = ৩ অংশ

* পিতা: ১২ এর ১/৬ = ২ অংশ

* মাতা: ১২ এর ১/৬ = ২ অংশ

* দুই কন্যা: ১২ এর ২/৩ = ৮ অংশ

**মোট অংশ:** ৩ + ২ + ২ + ৮ = ১৫।

যেহেতু মোট অংশের যোগফল (১৫) মূল ল.সা.গু (১২) এর চেয়ে বেশি হয়ে গেছে, তাই এখানে **’আউল’ (Increase)** নীতি প্রয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ এখন মোট সম্পত্তিকে ১২ ভাগের পরিবর্তে ১৫ ভাগ করে বণ্টন করতে হবে।

* **স্বামী পাবেন:** ৩/১৫ বা ১/৫ অংশ।

* **পিতা পাবেন:** ২/১৫ অংশ।

* **মাতা পাবেন:** ২/১৫ অংশ।

* **দুই কন্যা পাবেন: ৮/১৫ অংশ (প্রত্যেকে ৪/১৫ করে)।

খ) ‘আউল’ (Aul) ও ‘রদ’ (Rudd) নীতির ব্যাখ্যা:

১. আউল (Aul) বা বৃদ্ধি নীতি:

যখন কোনো মৃত ব্যক্তির নির্দিষ্ট অংশীদারদের (Sharers) নির্ধারিত অংশের যোগফল মোট সম্পত্তির (অর্থাৎ ১ বা সম্পূর্ণ অংশ) চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন আউল নীতি প্রয়োগ করা হয়।

পদ্ধতি: এক্ষেত্রে লঘিষ্ঠ সাধারণ হরকে (Denominator) বাড়িয়ে লবের (Numerator) যোগফলের সমান করা হয়। এর ফলে প্রত্যেক অংশীদারের প্রাপ্য অংশ আনুপাতিক হারে কিছুটা কমে যায়, কিন্তু সবাই সম্পত্তি পায়।

উদাহরণ: উপরের ‘ক’ নম্বর প্রশ্নে দেখা গেছে অংশীদারদের মোট পাওনা ছিল ১৫/১২। আউল নীতির কারণে হর ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৫ করা হয়েছে, ফলে ভারসাম্য রক্ষা হয়েছে।

২. রদ (Rudd) বা প্রত্যাবর্তন নীতি:

যখন নির্দিষ্ট অংশীদারদের (Sharers) তাদের প্রাপ্য অংশ দেওয়ার পর সম্পত্তি উদ্বৃত্ত থাকে এবং সেখানে কোনো ‘আসাবা’ বা অবশিষ্টভোগী (Residuaries) না থাকে, তখন সেই উদ্বৃত্ত অংশ পুনরায় অংশীদারদের মধ্যে তাদের অংশের অনুপাতে ফেরত দেওয়া হয়। একেই ‘রদ’ বলা হয়।

শর্ত: স্বামী বা স্ত্রী ‘রদ’ নীতিতে কোনো বাড়তি অংশ পান না (যদি অন্য কোনো অংশীদার বা দূরবর্তী আত্মীয় থাকে)।

উদাহরণ: যদি একজন ব্যক্তি কেবল মা এবং এক কন্যা রেখে মারা যান:

  – মাতা পাবেন ১/৬ এবং কন্যা পাবেন ১/২ (বা ৩/৬)।

  – মোট বণ্টন: ১/৬ + ৩/৬ = ৪/৬।

  – এখানে ২/৬ অংশ উদ্বৃত্ত থাকে। এই ২/৬ অংশ পুনরায় মা ও কন্যার মধ্যে তাদের অংশের অনুপাতে (১:৩) ফেরত দেওয়া হবে।

বিগত ১০ বছর ধরে বাংলাদেশের জব মার্কেট এবং আইনি ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং নিয়ে কাজ করার সুবাদে আমি দেখেছি, বিজিএস (BJS) বা সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত প্রস্তুতিতে ‘পারিবারিক সম্পর্ক বিষয়ক আইন’ বিষয়টি কতটা গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে যারা বিজিএস লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য ১৪শ বিজিএস ২০২১-এর প্রশ্নপত্রের বিশ্লেষণ এবং এর মানসম্মত উত্তর উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। একজন পরীক্ষার্থী যখন ‘পারিবারিক সম্পর্ক বিষয়ক আইন’ বা Family Relations Law নিয়ে পড়াশোনা করেন, তখন তাকে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান রাখলেই চলে না, বরং প্র্যাকটিক্যাল সমস্যা বা সমস্যার আইনি সমাধান (Legal Problem Solving) দেওয়ার দক্ষতাও অর্জন করতে হয়। আজকের এই দীর্ঘ আলোচনায় আমরা ১৪শ বিজিএস-এর ৮টি বড় প্রশ্নের সমাধান এমনভাবে আলোচনা করব, যা একজন জব সিকার বা চাকরিপ্রার্থীকে ইন্টারনেটে সঠিক রিসোর্স খুঁজে পেতে এবং পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।

প্রথমেই ইসলামিক আইন বিজ্ঞানের উৎস এবং বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা যাক। ইসলামিক আইন বিজ্ঞান বা ‘ফিকহ’ (Fiqh) মূলত পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক বিধানগুলোকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জটিল সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করার একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। কুরআন মুসলিম আইনের সর্বোচ্চ এবং চূড়ান্ত উৎস হলেও এটি একটি কমপ্লিট কোড অফ ল নয়, বরং এটি আইনের মূল স্পিরিট বা ভিত্তি প্রদান করে। তাই আধুনিক জীবনের অসংখ্য সমস্যার সমাধানে সুন্নাহ, ইজমা এবং কিয়াসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। প্রাক-ইসলামিক আরবে প্রচলিত অনেক সামাজিক প্রথা বা ‘উর্ফ’ (Urf) যেমন অনিয়ন্ত্রিত বহুবিবাহ বা উত্তরাধিকার বঞ্চিত করার প্রথাগুলোকে ইসলাম সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিক এবং ন্যায়বিচারপূর্ণ আইনে রূপান্তর করেছে। পরীক্ষার খাতায় এই উত্তরটি লেখার সময় উৎসের এই ধারাবাহিকতা বা হায়ারার্কি বজায় রাখা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, হক শুফা (Pre-emption) বা প্রাক-ক্রয় অধিকার হলো বিজিএস পরীক্ষার একটি ‘কমন’ টপিক। মুসলিম আইন অনুযায়ী হক শুফা হলো স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী বা অংশীদারের অগ্রাধিকারমূলক অধিকার। তবে এই অধিকারটি অত্যন্ত দুর্বল প্রকৃতির, কারণ এতে তিনটি ‘তলব’ বা ডিমান্ড অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পালন করতে হয়। সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে বিলম্ব না করে ‘তলব-ই-মওয়াসিবত’ করা, এরপর দুই সাক্ষীর সামনে ‘তলব-ই-ইশহাদ’ এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদালতের মাধ্যমে ‘তলব-ই-খাসুমত’ সম্পন্ন না করলে এই অধিকার চিরতরে লুপ্ত হয়। চাকরিপ্রার্থীরা অনেক সময় কনফিউজড হয়ে যান যে দান বা চিরস্থায়ী লীজ দেওয়া সম্পত্তিতে হক শুফা দাবি করা যায় কি না; উত্তর হলো না, কারণ হক শুফা কেবল চূড়ান্ত মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।

তৃতীয়ত, উইল বা ওসিয়ত (Will) সম্পর্কে আলোচনা করলে দেখা যায়, হানাফি আইন অনুযায়ী একজন সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম তার দাফন ও ঋণ পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) উইল করতে পারেন। যদি কেউ উত্তরাধিকারীর অনুকূলে উইল করতে চান, তবে দাতার মৃত্যুর পর অন্য সকল উত্তরাধিকারীর সম্মতি থাকা বাধ্যতামূলক। উইলের এই আইনি সীমাবদ্ধতা মূলত উত্তরাধিকার আইনের পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে যেন দাতা কাউকে বঞ্চিত করতে না পারেন। এছাড়া ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে ‘আউল’ (Increase) এবং ‘রদ’ (Return) নীতি দুটি গাণিতিক জটিলতা নিরসনে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। যখন অংশীদারদের প্রাপ্য অংশের যোগফল মূল সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায় তখন ‘আউল’ এবং যখন কম হয়ে যায় তখন ‘রদ’ নীতি প্রয়োগ করে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়।

চতুর্থত, বাংলাদেশে প্রচলিত অন্যান্য পারিবারিক আইন যেমন হিন্দু আইন এবং খ্রিস্টান আইনের ক্ষেত্রেও বিজিএস পরীক্ষার্থীদের স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। হিন্দু আইনে উত্তরাধিকারের দুটি প্রধান মতবাদ হলো দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা; যার মধ্যে দায়ভাগ বাংলায় বহুল প্রচলিত। অন্যদিকে ১৮৭২ সালের বিশেষ বিবাহ আইন হলো তাদের জন্য যারা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চান। এই আইনের একটি বিশেষ দিক হলো, এর অধীনে বিয়ে করলে দম্পতির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে ১৮২৫ সালের উত্তরাধিকার আইন কার্যকর হয়। অভিভাবকত্ব বা গার্ডিয়ানশিপ নিয়ে প্রশ্ন এলে মাতার ‘হিজানত’ বা প্রতিপালনের অধিকার এবং পিতার ‘ন্যাচারাল গার্ডিয়ান’ হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করতে হয়। পরিশেষে, ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের অধীনে গঠিত পারিবারিক আদালতগুলো মোহরানা, ভরণপোষণ এবং বিবাহ বিচ্ছেদের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করছে। একজন চাকরিপ্রার্থী যখন এই বিষয়গুলো ধারা এবং উচ্চ আদালতের রেফারেন্স দিয়ে সাজিয়ে লিখবেন, তখনই তিনি অন্যদের থেকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবেন।

চাকরিপ্রার্থীরা ইন্টারনেটে এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিশদ জানতে নিচের কিউওয়ার্ডগুলো ব্যবহার করতে পারেন:

* BJS Written Family Law Questions and Answers 2026.

* International Driving Permit for Bangladeshi Students Abroad.

* Best way to learn driving for foreign education.

* Muslim Inheritance Law Bangladesh Aul and Rudd.

* Family Court Ordinance 1985 Jurisdiction Bangla PDF.

এই দীর্ঘ আলোচনা এবং আইনি গাইডলাইনগুলো কেবল পরীক্ষার জন্যই নয়, বরং বাস্তব জীবনেও একজন আইনজীবীকে সুসংগঠিতভাবে আইনি পরামর্শ দিতে সহায়তা করবে। দেখা হবে বিজয়ে। শুভকামনা রইল।

Leave a Comment

Telegram
WhatsApp
FbMessenger