জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ভর্তি A to Z খরচসহ

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রফেশনাল মাস্টার্স কোর্সটি বর্তমানে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে উন্নতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ১০ বছর ধরে এই শিক্ষা ব্যবস্থার চড়াই-উতরাই দেখার সুবাদে আমি আজ তোমাদের সামনে এই কোর্সের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরছি। এই গাইডলাইনটি পড়লে তোমার মনে প্রফেশনাল মাস্টার্স নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না।

 

প্রফেশনাল মাস্টার্স আসলে কী এবং কাদের জন্য

 

আমরা সাধারণত যে মাস্টার্স করি তাকে বলা হয় রেগুলার মাস্টার্স। সেটি মূলত অ্যাকাডেমিক বা গবেষণাধর্মী। কিন্তু প্রফেশনাল মাস্টার্স বা পেশাদারী স্নাতকোত্তর কোর্সটি ডিজাইন করা হয়েছে নির্দিষ্ট কোনো পেশার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য। এটি মূলত কর্মমুখী শিক্ষা। যারা অলরেডি কোনো চাকরিতে আছো কিন্তু প্রমোশনের জন্য ডিগ্রি দরকার, অথবা যারা নতুন করে কোনো টেকনিক্যাল সেক্টরে (যেমন আইটি, ল বা বিজনেস) ক্যারিয়ার গড়তে চাও, তাদের জন্য এটি আদর্শ। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ক্লাস হয় শুক্র ও শনিবার, যা চাকরিজীবীদের জন্য আশীর্বাদ।

 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেশনাল মাস্টার্স কোর্সের প্রকারভেদ

 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন ধরনের প্রফেশনাল কোর্স অফার করে থাকে। তোমার ব্যাকগ্রাউন্ড অনুযায়ী তুমি সঠিক কোর্সটি বেছে নিতে পারো:

 

১. এমবিএ প্রফেশনাল (MBA Professional): কমার্স বা নন-কমার্স উভয় ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরা এটি করতে পারে। এর অধীনে একাউন্টিং, ফিন্যান্স, মার্কেটিং, ম্যানেজমেন্ট এবং এইচআরএম বিভাগ রয়েছে।

২. এলএলএম প্রফেশনাল (LLM Professional): যারা আইন বিষয়ে স্নাতক বা এলএলবি (পাস) করেছ, তাদের পেশাগত দক্ষতার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর।

৩. বিএড (B.Ed) ও এমএড (M.Ed): সরকারি বা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতে চাইলে বা প্রমোশন পেতে চাইলে এই কোর্সগুলো করা প্রায় বাধ্যতামূলক।

৪. মাস্টার্স ইন অ্যাপ্লায়েড ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ ম্যানেজমেন্ট: এটি বিশেষায়িত কোর্স যা পুলিশ বাহিনী বা নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট পেশায় জড়িতদের জন্য উপযোগী।

৫. এমএসসি ইন কম্পিউটার সায়েন্স: আইটি প্রফেশনালদের জন্য এটি একটি উচ্চতর ডিগ্রি।

৬. লাইব্রেরি সায়েন্স ও ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট: এই বিশেষায়িত সেক্টরগুলোতেও প্রফেশনাল মাস্টার্স করার সুযোগ রয়েছে।

 

ভর্তির যোগ্যতা ও নিয়মাবলী

 

প্রফেশনাল মাস্টার্সে ভর্তি হতে হলে তোমাকে কিছু নূন্যতম শর্ত পূরণ করতে হবে:

১. স্নাতক (অনার্স) বা স্নাতক (পাস) কোর্সে নূন্যতম দ্বিতীয় বিভাগ অথবা জিপিএ/সিজিপিএ ২.২৫ থাকতে হবে।

২. বিএড বা এমএড কোর্সের জন্য শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকলে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়।

৩. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেশনাল কোর্সে ভর্তির জন্য কোনো বয়সসীমা নেই, তাই যেকোনো বয়সে ক্যারিয়ার রিস্টার্ট করা সম্ভব।

৪. যারা আগে অন্য কোনো বিষয়ে মাস্টার্স করেছ, তারাও চাইলে দ্বিতীয় মাস্টার্স হিসেবে এটি করতে পারো।

 

ভর্তি প্রক্রিয়া ও গুরুত্বপূর্ণ লিংক

 

এই কোর্সে ভর্তি হতে হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ভর্তি ওয়েবসাইট (app1.nu.edu.bd) ব্যবহার করতে হবে। সাধারণত বছরে দুইবার (জানুয়ারি এবং জুলাই সেশন) ভর্তির সার্কুলার দেওয়া হয়। আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয় অনলাইনে এবং আবেদন ফি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের (বিকাশ, রকেট বা নগদ) মাধ্যমে জমা দিতে হয়। আবেদন করার পর তোমার তথ্য যাচাই-বাছাই করে মেধা তালিকা বা সরাসরি ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়।

 

কোর্স ফি ও ব্যয়ের ধারণা

 

প্রফেশনাল মাস্টার্স কোর্সটি সলফ-ফিন্যান্সড অর্থাৎ এটি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব খরচে পড়তে হয়। তাই খরচ রেগুলার কোর্সের চেয়ে একটু বেশি।

১. এমবিএ প্রফেশনাল: মোট খরচ ৪৫,০০০ থেকে ৬৫,০০০ টাকার মতো হতে পারে।

২. বিএড/এমএড: খরচ ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকার আশেপাশে।

৩. এলএলএম বা এমএসসি: খরচ ৫০,০০০ থেকে ৮০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

এই পুরো টাকাটা একবারে দিতে হয় না। সেমিস্টার ভিত্তিক কিস্তিতে পরিশোধ করার সুযোগ থাকে। সরকারি কলেজের তুলনায় বেসরকারি কলেজে এই খরচের পরিমাণ একটু বেশি হতে পারে।

 

কেন তুমি প্রফেশনাল মাস্টার্স করবে

 

১. সময়ের সঠিক ব্যবহার: সপ্তাহে মাত্র দুই দিন ক্লাস করে তুমি একটি ভ্যালিড মাস্টার্স সার্টিফিকেট পাচ্ছ। বাকি পাঁচ দিন তুমি নিশ্চিন্তে অফিস বা অন্য কাজ করতে পারছ।

২. বিসিএস ও সরকারি চাকরির সুযোগ: এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টার্স ডিগ্রি। তাই বিসিএসসহ যেকোনো সরকারি চাকরিতে যেখানে মাস্টার্স চাওয়া হয়, সেখানে তুমি এটি ব্যবহার করতে পারবে।

৩. প্রমোশন ও বেতন বৃদ্ধি: অনেক ক্ষেত্রে চাকরিতে উচ্চতর গ্রেড পেতে হলে মাস্টার্স ডিগ্রি প্রয়োজন হয়। প্রফেশনাল মাস্টার্স সেই চাহিদা পূরণ করে।

৪. নেটওয়ার্কিং: এই কোর্সগুলোতে বিভিন্ন সেক্টরের পেশাদার মানুষরা ভর্তি হয়। তাদের সাথে পরিচয় ও সুসম্পর্ক তোমার ভবিষ্যতের প্রফেশনাল লাইফে অনেক উপকারে আসবে।

 

রেগুলার মাস্টার্স বনাম প্রফেশনাল মাস্টার্স

 

 

অনেকেই কনফিউজড থাকে যে কোনটা ভালো। রেগুলার মাস্টার্স মূলত থিওরিটিক্যাল, যেখানে বইয়ের পড়া বেশি। আর প্রফেশনাল মাস্টার্স হলো প্র্যাকটিক্যাল, যেখানে কেস স্টাডি বা কাজের অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। যদি তোমার লক্ষ্য হয় শিক্ষকতা বা গবেষণা, তবে রেগুলার ভালো। আর যদি লক্ষ্য হয় কর্পোরেট জব বা প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট, তবে প্রফেশনাল মাস্টার্স সেরা।

 

পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি

 

প্রফেশনাল মাস্টার্সে সাধারণত সেমিস্টার সিস্টেম অনুসরণ করা হয়। প্রতি ৬ মাস অন্তর সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা হয়। এছাড়া প্রতিটি কোর্সে ইনকোর্স পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট এবং প্রেজেন্টেশন থাকে। এই ছোট ছোট পরীক্ষাগুলো তোমার ফাইনাল রেজাল্টে বড় প্রভাব ফেলে। তাই প্রতিটি অ্যাসাইনমেন্ট খুব গুরুত্বের সাথে তৈরি করতে হবে।

 

কিভাবে প্রস্তুতি নেবে এবং সফল হবে

 

১০ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি যারা সফল হয় তারা কিছু নির্দিষ্ট কৌশল মেনে চলে:

১. নিয়মিত ক্লাস অ্যাটেন্ডেন্স: সপ্তাহে মাত্র দুই দিন ক্লাস, তাই একটা ক্লাসও মিস করো না। টিচাররা ক্লাসে যা আলোচনা করেন তার থেকেই অধিকাংশ প্রশ্ন আসে।

২. স্টাডি ম্যাটেরিয়াল সংগ্রহ: যেহেতু তুমি চাকরিজীবী, তাই হাতে সময় কম। ভালো মানের গাইড বা সিনিয়রদের নোট সংগ্রহ করে রাখো।

৩. লজিক্যাল রাইটিং: প্রফেশনাল কোর্সের পরীক্ষায় পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে লজিক্যাল বা যৌক্তিক লেখা বেশি পছন্দ করা হয়। তাই বিষয়গুলো মুখস্থ না করে বোঝার চেষ্টা করো।

৪. ইংরেজি ভীতি দূর করা: এমবিএ বা এমএসসি-র মতো কোর্সগুলোর প্রশ্ন সাধারণত ইংরেজিতে হয়। তাই ছোট ছোট বাক্য ইংরেজিতে লেখার অভ্যাস করো।

 

প্রফেশনাল মাস্টার্স নিয়ে কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসার উত্তর

 

১. আমি কি ডিগ্রি পাস করে সরাসরি এমবিএ করতে পারব?

হ্যাঁ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ বছর মেয়াদী প্রফেশনাল এমবিএ কোর্স রয়েছে যা ডিগ্রি পাস করা শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।

২. এই সার্টিফিকেটের কি বিদেশের ইউনিভার্সিটিতে গ্রহণযোগ্যতা আছে?

অবশ্যই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় একটি সরকারি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান। এই সার্টিফিকেট দিয়ে তুমি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে পারবে।

৩. পরীক্ষার সেন্টার কোথায় পড়ে?

সাধারণত তুমি যে কলেজে ভর্তি হয়েছ, সেখানেই পরীক্ষা হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে জেলা শহরের সরকারি কলেজে সিট পড়তে পারে।

৪. কতদিন সময় লাগে কোর্স শেষ হতে?

১ বছর বা ২ বছর—এটি নির্ভর করে তোমার চুজ করা কোর্সের ওপর। তবে সেশন জট এখন নেই বললেই চলে, তাই নির্দিষ্ট সময়েই কোর্স শেষ হয়।

 

পরিশেষে এটাই বলব, পড়াশোনার কোনো বয়স নেই। তুমি যদি মনে করো তোমার ক্যারিয়ার আটকে আছে একটি ডিগ্রির জন্য, তবে প্রফেশনাল মাস্টার্স হতে পারে তোমার সেই জাদুর চাবি। এটি কেবল একটি সার্টিফিকেট নয়, এটি তোমার যোগ্যতাকে এক ধাপ উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া।

 

যেকোনো নতুন সার্কুলার বা ভর্তির তথ্যের জন্য নিয়মিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট চেক করো এবং বিশ্বস্ত সূত্র থেকে তথ্য নাও। আমি তো আছিই তোমাদের যেকোনো প্রয়োজনে। মন দিয়ে পড়াশোনা করো আর নিজের লক্ষ্য স্থির রাখো। শুভকামনা তোমাদের সবার জন্য।

Leave a Comment

Telegram
WhatsApp
FbMessenger